হোম » খাদ্য ও পুষ্টি » জাম: পুষ্টিগুণে ভরপুর গ্রীষ্মকালীন ফল

জাম: পুষ্টিগুণে ভরপুর গ্রীষ্মকালীন ফল

জাম একটি গ্রীষ্মকালীন ফল, যা পুষ্টিগুণে অতুলনীয়। খোসা ছাড়াতে না হওয়ায় জাম খাওয়া খুব সহজ এবং ছোটদের প্রিয়। জামের রয়েছে অনেক স্বাস্থ্য উপকারিতা। আসুন জেনে নিই জামের বিভিন্ন উপকারী দিক সম্পর্কে।

গ্রীষ্মকালীন ফল জাম

জাম আমাদের দেশে গ্রীষ্মকালে পাওয়া যায় এবং এটি অন্যতম একটি জনপ্রিয় ফল। ফলের আকার অনুযায়ী জাম দুই ধরনের পাওয়া যায়: বড় জাম বা কালোজাম এবং ছোটজাম। এর স্থায়ীত্বকাল কম হলেও পুষ্টিগুণে ভরপুর। জাম ভিটামিন সি, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ফাইবার, জিংক, কপার, গ্লুকোজ, ডেক্সটোজ এবং ফ্রুকটোজ সমৃদ্ধ। এসব পুষ্টি উপাদান আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী।

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি

জামে রয়েছে ফাইটো কেমিক্যালস এবং অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, যা দেহের প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। এটি মৌসুমি সর্দি-কাশি ও ইনফেকশন নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। জামে এক ধরনের এসিড রয়েছে যা ক্ষতিকর ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও ফাঙ্গাশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে ত্বককে শক্তিশালী করে। এছাড়া ক্ষতিকর আল্ট্রা-ভায়োলেট রশ্মির প্রভাব থেকে ত্বক ও চুলকে রক্ষা করতেও জামের ভূমিকা রয়েছে।

মানসিক সতেজতা এবং স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি

জামে গ্লোকোজ, ডেক্সটোজ ও ফ্রুকটোজ উপাদান থাকায় তা কাজ করার প্রয়োজনীয় শক্তির জোগান দেয়। বয়স বাড়ার সাথে মানুষের স্মৃতিশক্তি কমতে থাকে, যা প্রখর রাখতে জামের ভূমিকা রয়েছে। তাই সব বয়সের মানুষের এই মৌসুমি ফলটি খাওয়া উচিত।

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ

ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য জাম অত্যন্ত উপকারী। এটি রক্তে চিনির মাত্রা কমাতে সাহায্য করে এবং ডায়াবেটিস রোগীদের রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণ করে শরীর সুস্থ রাখতে সহায়তা করে। গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত জাম খাওয়ার ফলে মানুষের ডায়াবেটিস উল্লেখযোগ্য হারে কমে যায়। প্রতিদিন সকালে খালি পেটে এক চা চামচ জামের বীচির গুঁড়া খেলে ডায়াবেটিস অনেক নিয়ন্ত্রণে থাকে।

ভিটামিন সি-এর ঘাটতি পূরণ

জামে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি থাকার জন্য এটি দেহে ভিটামিনের ঘাটতি পূরণের পাশাপাশি ভিটামিন সি-এর অভাবজনিত রোগ প্রতিরোধে সহায়তা করে। দাঁত ও দাঁতের মাড়ি মজবুত, ক্ষয়রোধ এবং মুখের দুর্গন্ধ রোধেও জামের জুড়ি নেই। জামে থাকা পানি, লবণ ও পটাসিয়াম শরীর ঠান্ডা রাখতে এবং শারীরিক দুর্বলতা দূর করতে সহায়তা করে। আয়রন থাকায় রক্তস্বল্পতা দূরীকরণে বিশেষ ভূমিকা রাখে। যাদের মাড়ি আলগা হয়ে গেছে, একটুতেই রক্ত পড়ে, তারা জামছালের গুঁড়া দিয়ে দাঁত মাজলে উপকার পাবেন।

উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ এবং হৃদরোগ প্রতিরোধ

পুষ্টিবিদ এবং চিকিৎসকরা তাজা ফল এবং সবজি খাওয়ার পরামর্শ দেন। জামে থাকা উপাদান উচ্চ রক্তচাপ কমাতে সহায়তা করে। জাম শরীরের দূষিত কার্বন-ডাই-অক্সাইডের মাত্রা হ্রাস করে এবং দেহের প্রতিটি অংশে অক্সিজেন সরবরাহ কার্যক্রমে সহায়তা করে। এছাড়া রক্তের কোলেস্টেরলের পরিমাণ কমিয়ে হৃদপিন্ড ভালো রাখতে জামের ভূমিকা রয়েছে।

ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়তা

জামে ক্যালোরির পরিমাণ কম থাকে। যারা ওজন নিয়ে চিন্তায় আছেন এবং নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছেন তাদের খাদ্য তালিকায় জাম রাখা যেতে পারে।

রক্ত আমাশয় দূরীকরণ

রক্ত আমাশয় দূরীকরণে জামের কচি পাতার রস ২-৩ চা চামচ একটু গরম করে ছেঁকে নিয়ে খেলে ২-৩ দিনের মধ্যে তা সেরে যায়।

পচা ঘা বা ক্ষত সারাতে

পচা ঘা বা ক্ষত সারাতে জাম পাতা সিদ্ধ করে সেই কাথ দিয়ে ঘা ধুয়ে দিলে ২-৪ দিনের মধ্যে অনেক উপকার পাওয়া যায়। যে ঘা তাড়াতাড়ি সেরে উঠছে না, সেখানে জাম ছালের মিহি গুঁড়া ছড়িয়ে দিলে ক্ষত তাড়াতাড়ি পূর্ণ হয়ে যায়। পশুপাখির ক্ষেত্রেও এটি প্রয়োগ করা যেতে পারে।

ক্যান্সার প্রতিরোধে কালো জাম

জাম মুখের ভেতর উৎপাদিত ক্যান্সারের সহায়ক ব্যাকটেরিয়ার প্রভাব মুক্ত করে মুখের ক্যান্সার প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এছাড়া জরায়ু, ডিম্বাশয় এবং মলদ্বারের ক্যান্সারের বিরুদ্ধেও জামের কার্যকারিতা প্রমাণিত।

জৈব কীটনাশক হিসেবে জাম

জাম পাতার রস শস্য বীজ শোধনে ব্যবহার করা যায়। জামের পাতা পিসে রস করে ১:৪ অনুপাতে দ্রবণ তৈরি করে শস্য ও সবজি বীজ শোধন করা যায়।

উপসংহার

জাম আমাদের দেশের একটি জনপ্রিয় ফল। এটি শুধু রসনাতৃপ্তি মেটায় না, বরং এর মধ্যে রয়েছে প্রচুর পুষ্টিগুণ। তাই নিয়মিত জাম খাওয়ার মাধ্যমে সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা দরকার। তবে ভরা পেটে পাকা জাম খেলে অতিরিক্ত অ্যাসিডিটি এবং পেটে ব্যথা হতে পারে, তাই এই বিষয়টি খেয়াল রাখা উচিত।

জামের পুষ্টিগুণ এবং স্বাস্থ্য উপকারিতা সম্পর্কে জানার পর, এটি আপনার খাদ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। পুষ্টিকর এই ফলটি আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য সত্যিই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত জাম খাওয়ার মাধ্যমে আপনি পাবেন সুস্বাস্থ্য এবং দীর্ঘায়ু।

Leave a Comment