হোম » স্বাস্থ্য তথ্য » কম্পিউটারের সামনে এক নাগাড়ে বসে কাজ করার ক্ষতিসমূহ ও করণীয়

কম্পিউটারের সামনে এক নাগাড়ে বসে কাজ করার ক্ষতিসমূহ ও করণীয়

বর্তমান যুগে কম্পিউটার ছাড়া কাজ করা কল্পনাই করা যায় না। অফিসের কাজ থেকে শুরু করে শিক্ষাক্ষেত্র, বিনোদন, সামাজিক যোগাযোগ, এমনকি দৈনন্দিন কাজকর্মেও কম্পিউটার অপরিহার্য। তবে, এক নাগাড়ে কম্পিউটারের সামনে বসে কাজ করার ফলে বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। এসব সমস্যা এড়ানোর জন্য কিছু করণীয় বিষয় জানা অত্যন্ত জরুরি। আসুন, কম্পিউটারের সামনে এক নাগাড়ে বসে কাজ করার ক্ষতিসমূহ এবং তা থেকে মুক্তির উপায় সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে জানি।

অধিক সময় বসে থাকার বিভিন্ন অসুবিধা

দীর্ঘক্ষণ এক জায়গায় বসে থাকার ফলে শরীরে বিভিন্ন ধরণের সমস্যা দেখা দেয়। এর মধ্যে পিঠে ব্যথা, গাঁটে ব্যথা, রক্ত চলাচল ব্যাহত হওয়া, ওজন বৃদ্ধি এবং হৃদরোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্য। একটানা বসে থাকার ফলে শরীরের পেশীগুলোর কার্যক্ষমতা কমে যায়, ফলে পেশী দুর্বল হয়ে পড়ে। এছাড়া, ডেস্কে বসে একটানা কাজ করলে গ্লুকোজ ও লিপিড বিপাকের প্রভাব কমে যায়, যা ডায়াবেটিস ও স্থূলতার কারণ হতে পারে।

করণীয়: প্রতি এক ঘণ্টা পরপর ৫-১০ মিনিটের জন্য বিরতি নিন। বিরতির সময় কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি বা স্ট্রেচিং ব্যায়াম করতে পারেন। দিনে একাধিকবার ছোট ছোট বিরতি নিন, যাতে শরীরের রক্ত চলাচল সঠিক থাকে। এছাড়া মাঝে মাঝে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে কাজ করার অভ্যাস গড়ে তুলুন।

খারাপ দেহভঙ্গিমার কারণে শরীরে অসহ্য যন্ত্রণা

সঠিক ভঙ্গিতে বসে না থাকলে কাঁধ, ঘাড় ও পিঠে ব্যথা হতে পারে। কম্পিউটারের সামনে সঠিকভাবে বসে কাজ না করলে মেরুদণ্ডে চাপ পড়ে এবং পেশীগুলোতে টান লাগে। এছাড়া টাইপ করার সময় হাত ও আঙুলে অতিরিক্ত চাপ পড়তে পারে, যা পরবর্তীতে কারপাল টানেল সিনড্রোমের কারণ হতে পারে।

করণীয়: সঠিক দেহভঙ্গিতে বসুন। চেয়ারে বসার সময় মেরুদণ্ড সোজা রেখে বসুন এবং পায়ের তলায় মাটি স্পর্শ করুন। মনিটর চোখের সমান উচ্চতায় রাখুন এবং মনিটরের স্ক্রিন থেকে চোখের দূরত্ব প্রায় ২০-২৪ ইঞ্চি রাখুন। টাইপ করার সময় কবজিকে রক্ষা করার জন্য জেল প্যাড ব্যবহার করুন।

একটানা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার কারণে চোখের ক্ষতিসমূহ

কম্পিউটারের স্ক্রিনের দিকে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থাকলে চোখের ওপর মারাত্মক চাপ পড়ে। এর ফলে চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যাওয়া, চোখে জ্বালা, মাথাব্যথা, চোখের শুষ্কতা ইত্যাদি সমস্যা দেখা দিতে পারে। অনেক সময় একটানা স্ক্রিনে কাজ করার ফলে ‘কম্পিউটার ভিশন সিনড্রোম’ নামক সমস্যা হতে পারে, যা চোখের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।

করণীয়: প্রতি ২০ মিনিট পরপর ২০ সেকেন্ডের জন্য ২০ ফুট দূরের কোনো বস্তুর দিকে তাকান (২০-২০-২০ নিয়ম)। স্ক্রিনের উজ্জ্বলতা ও কন্ট্রাস্ট সঠিকভাবে সামঞ্জস্য করুন। উচ্চ রেজোলিউশনের মনিটর ব্যবহার করুন এবং চোখের সঙ্গে মনিটরের দূরত্ব বজায় রাখুন। প্রয়োজনে ডাক্তার দেখিয়ে চোখের ড্রপ ব্যবহার করতে পারেন।

দুশ্চিন্তা ও বিষণ্ণতার বৃদ্ধি

দীর্ঘক্ষণ কম্পিউটারের সামনে বসে থাকার কারণে মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তার সমস্যা দেখা দেয়। একটানা কাজের ফলে মানসিক অবসাদ ও বিষণ্ণতা দেখা দিতে পারে। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগ কমে যাওয়ার কারণে মানসিক সমস্যা আরও বাড়তে পারে।

করণীয়: কাজের ফাঁকে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিন এবং সহকর্মী বা পরিবারের সাথে সময় কাটান। প্রতিদিন নিয়মিত ব্যায়াম করুন এবং মানসিক চাপ কমানোর জন্য মেডিটেশন বা ইয়োগার আশ্রয় নিতে পারেন। হাইড্রেটেড থাকতে প্রচুর পানি পান করুন এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখুন।

অতিরিক্ত কম্পিউটার ব্যবহারের স্বাস্থ্যঝুঁকি ও সমাধান

বর্তমানে প্রায় সাত কোটি কর্মী কম্পিউটার ভিশন সিনড্রোমের ঝুঁকিতে রয়েছেন এবং এই সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। দিনে মাত্র তিন ঘণ্টা কম্পিউটার ব্যবহার করলেও এই ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। যারা আরও বেশি সময় ধরে কম্পিউটারে কাজ করেন, তাদের টানা মাথাব্যথা, ঘাড় ও পিঠে ব্যথাও হতে পারে। তাই একটানা কম্পিউটারের দিকে না তাকিয়ে কাজ করে মাঝে মাঝে বিরতি নেওয়া জরুরি। নিয়ম মেনে কাজ করুন এবং সুস্থ থাকুন।

সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও পানি পান

দীর্ঘক্ষণ কম্পিউটারে কাজ করার ফলে শরীরে পানি শূন্যতা দেখা দিতে পারে। এছাড়া, অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাসের ফলে শরীরে পুষ্টির ঘাটতি দেখা দেয়, যা স্বাস্থ্যহানি ঘটাতে পারে।

করণীয়: প্রতিদিন পর্যাপ্ত পানি পান করুন। হালকা ও স্বাস্থ্যকর খাবার খান, যাতে পুষ্টির ঘাটতি পূরণ হয়। অস্বাস্থ্যকর খাবার পরিহার করুন এবং বেশি বেশি ফল ও শাকসবজি খান। অফিসে কাজ করার সময় হালকা স্ন্যাকস যেমন বাদাম, ফল ইত্যাদি খেতে পারেন।

পর্যাপ্ত ঘুমের প্রয়োজনীয়তা

পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবে শরীর ও মন ক্লান্ত হয়ে পড়ে, যা কর্মক্ষমতা ও সুস্থতার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। কম্পিউটারের সামনে দীর্ঘক্ষণ কাজ করলে অনেকের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে এবং ইনসোমনিয়া দেখা দেয়।

করণীয়: প্রতিদিন ৭-৮ ঘণ্টা ঘুমান। ঘুমানোর আগে ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকুন। ঘুমানোর সময় ঘর অন্ধকার ও নিরিবিলি রাখুন। নিয়মিত ঘুমের সময় নির্ধারণ করুন এবং তা মেনে চলুন।

শেষকথা

একটানা কম্পিউটারের সামনে বসে কাজ করা থেকে সৃষ্ট শারীরিক ও মানসিক সমস্যাগুলো উপেক্ষা করা উচিত নয়। সঠিক দেহভঙ্গি, পর্যাপ্ত বিশ্রাম, নিয়মিত ব্যায়াম, সঠিক খাদ্যাভ্যাস, এবং পর্যাপ্ত ঘুমের মাধ্যমে এসব সমস্যা থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব। প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে সহজ করেছে, তবে এর সঠিক ব্যবহার ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার দিকে খেয়াল রাখা জরুরি। নিয়ম মেনে কাজ করুন এবং সুস্থ থাকুন।

Leave a Comment