হোম » স্বাস্থ্য তথ্য » গ্যাস্ট্রিকের ওষুধের দীর্ঘমেয়াদী ব্যবহারের ভয়াবহতা

গ্যাস্ট্রিকের ওষুধের দীর্ঘমেয়াদী ব্যবহারের ভয়াবহতা

গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ আমাদের দৈনন্দিন জীবনের একটি অংশ হয়ে উঠেছে। সামান্য পেটের সমস্যায় আমরা অনেকেই গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ খেতে দ্বিধাবোধ করি না। কিন্তু এই ওষুধগুলি দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজন ছাড়া সেবন করলে তা মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। আসুন জেনে নেই গ্যাস্ট্রিকের ওষুধের দীর্ঘমেয়াদী ব্যবহারের ভয়াবহতা সম্পর্কে এবং ওষুধ ছাড়াই গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা দূর করার ঘরোয়া পদ্ধতি।

দীর্ঘদিন গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ সেবনের ক্ষতি

হাইপারগ্যাস্ট্রিনেমিয়া

দীর্ঘদিন গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ সেবনে হাইপারগ্যাস্ট্রিনেমিয়া হতে পারে। এটি একটি অবস্থা যেখানে গ্যাস্ট্রিন হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়। এটি ওষুধ বন্ধ করার পর গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা আরো ভয়ানক আকার ধারণ করতে পারে।

হাড় ক্ষয় এবং ভেঙে যাওয়ার প্রবণতা

গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ দীর্ঘমেয়াদী সেবনে খাদ্য থেকে প্রাপ্ত ক্যালসিয়ামের শোষণ কমে যায়। একটি স্টাডিতে দেখা গেছে যে ওমেপ্রাজল থেরাপির ১৪ দিন পরেই ক্যালসিয়াম শোষণ ৪১% পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে। এর ফলে হাড় ক্ষয় এবং অল্প আঘাতে হাড় ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

হাইপোম্যাগনেসিমিয়া

দীর্ঘদিন গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ সেবনে হাইপোম্যাগনেসিমিয়া হতে পারে, যা পেশী দুর্বলতা, ক্র্যাম্প, খিঁচুনি এবং হার্টের সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। ৫ বছরের বেশি সময় ধরে ওষুধ সেবনে হাইপোম্যাগনেসিমিয়ার ঝুঁকি ৪০% এর বেশি।

ভিটামিন বি ১২ এর অভাব

গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ দীর্ঘমেয়াদী সেবনে ভিটামিন বি ১২ এর অভাব হতে পারে। বয়স্কদের মধ্যে এই সমস্যা বেশি দেখা যায়, কারণ তাদের শরীরে ভিটামিন বি ১২ এর শোষণ কমে যায়।

সংক্রমণ ও অন্যান্য সমস্যা

গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ পাকস্থলীর হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিডের নিঃসরণ কমিয়ে দেয়, যা খাবারের জীবাণু ধ্বংস করে এবং লৌহ শোষণে সাহায্য করে। এর ফলে শরীরে বিভিন্ন জীবাণু সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে এবং রক্তশূন্যতা, হাড়ের ক্ষয়রোগ, বৃক্কের কার্যকারিতা হ্রাস এবং গ্যাস্ট্রিক পলিপের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।

গ্যাস্ট্রিকের ওষুধের প্রকারভেদ ও প্রভাব

প্রোটন-পাম্প ইনহিবিটরস (PPIs)

প্রোটন-পাম্প ইনহিবিটরস (PPIs) যেমন ওমিপ্রাজল, ইসোমিপ্রাজল, প্যান্টোপ্রাজল, ল্যানসোপ্রাজল, রেবিপ্রাজল প্রভৃতি গ্যাস্ট্রিক আলসার এবং অ্যাসিডিটির চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। এই ওষুধগুলি পাকস্থলীর অ্যাসিড নিঃসরণ কমিয়ে দেয়, যার ফলে পাকস্থলীর অম্লতা কমে এবং গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা লাঘব হয়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী ব্যবহারে এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে। বাংলাদেশে প্রায় ৭০-৮০% মানুষ প্রোটন-পাম্প ইনহিবিটর বা অ্যান্টি আলসারেন্ট জাতীয় ওষুধ অপ্রয়োজনীনে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই দীর্ঘদিন সেবন করেন। অধিকাংশের ধারণা, এই ওষুধগুলির কোনো ক্ষতিকর দিক নেই, যদিও বাস্তবে কোনো ওষুধই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ামুক্ত নয়।

অ্যান্টাসিড

অ্যান্টাসিড যেমন ম্যাগনেসিয়াম হাইড্রক্সাইড, অ্যালুমিনিয়াম হাইড্রক্সাইড, ক্যালসিয়াম কার্বোনেট প্রভৃতি পাকস্থলীর অ্যাসিডকে নিরপেক্ষ করে। যদিও এটি তৎক্ষণাৎ স্বস্তি দেয়, তবে দীর্ঘমেয়াদী ব্যবহারে কোষ্ঠকাঠিন্য, ডায়রিয়া এবং কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা দূর করবে সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও সুষম ডায়েট

গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা দূর করতে সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও সুষম ডায়েট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঝাল, তেল-মসলাজাতীয় খাবার এড়িয়ে চলুন এবং সুষম ডায়েট মেনে চলুন। এতে গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা কমে যাবে এবং ওষুধের প্রয়োজনও কমে যাবে।

ঘরোয়া উপায়ে গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা সমাধান

১. আদা

আদা গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা কমাতে সাহায্য করে। এটি পাকস্থলীর অ্যাসিড নিঃসরণ কমিয়ে দেয় এবং হজমশক্তি বাড়ায়।

২. এলাচ

এলাচ গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা কমাতে সাহায্য করে। এটি পাকস্থলীর অ্যাসিড নিয়ন্ত্রণ করে এবং হজমশক্তি বাড়ায়।

৩. দই

দই প্রোবায়োটিক সমৃদ্ধ হওয়ায় এটি হজমশক্তি বাড়ায় এবং গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা কমায়।

৪. পানি

প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পান করুন। এটি হজমশক্তি বাড়ায় এবং গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা কমায়।

চিকিৎসকের পরামর্শ

গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ সেবনের আগে এবং পরে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। নিজের রোগ সম্পর্কে জেনে ওষুধ সেবন করুন এবং প্রয়োজন ছাড়া ওষুধ খাওয়া এড়িয়ে চলুন। বড় ধরনের সমস্যা এড়াতে ডাক্তারের দেওয়া নির্দিষ্ট সময়ের পরে গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ খাওয়া বন্ধ করুন।

গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ সেবনের নিয়ম

গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ সেবনের যেমন নিয়ম আছে, তেমনি তা ছাড়ারও নিয়ম আছে। ওষুধ সেবন শুরু করার আগে এবং বন্ধ করার ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

শেষকথা

গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ প্রয়োজন ছাড়া দীর্ঘদিন সেবন করা মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। হাড় ক্ষয়, সংক্রমণ, ভিটামিন ও খনিজের অভাব ইত্যাদি সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও সুষম ডায়েট মেনে চলুন এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন করুন। নিজের স্বাস্থ্য রক্ষায় সতর্ক থাকুন এবং প্রাকৃতিক উপায়ে গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করুন।

গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা একটি সাধারণ সমস্যা হলেও এর জন্য দীর্ঘমেয়াদী ওষুধ সেবন মারাত্মক ক্ষতির কারন হতে পারে। সঠিক খাদ্যাভ্যাস, সুষম ডায়েট এবং প্রাকৃতিক উপায়ে গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা সমাধান সম্ভব। চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে ওষুধ সেবন করুন এবং প্রয়োজন ছাড়া ওষুধ খাওয়া থেকে বিরত থাকুন। আপনার সুস্থতা আপনার হাতেই।

Leave a Comment