Header Ads

ফরজ গোসলের সঠিক নিয়ম কি?

গোসলের ফরজ কয়টি ও কি কি?ইসলামের যাবতীয় হুকুম-আহকাম পালন পবিত্রতার উপর নির্ভর করে। এ জন্য পবিত্রতাকে ইসলামে ঈমানের অঙ্গ বলা হয়েছে। পবিত্রতা অর্জনের জন্য ইসলামের কিছু সুনির্দিষ্ট পন্থা রয়েছে। যেমনঃ- গোসল, অজু, খাওয়ার আগে হাত ধোয়া, দাঁত পরিষ্কার রাখতে মেসওয়াক করা, শরীরে ময়লা লাগলে ধুয়ে ফেলা ইত্যাদি। শুধু ব্যক্তি জীবনে নয়, সামাজিক জীবনেও পবিত্রতা অর্জনের দিকে লক্ষ্য রাখতে ইসলাম নির্দেশ দেয়। যাইহোক, আজ আমরা জানব ফরজ গোসলের সঠিক নিয়ম কি? গোসলের ফরজ কয়টি ও কি কি? এবং যেসব কারনে গোসল ফরয হয় সেসব নিয়ে বিস্তারিত জানব।

রাতে স্বামী-স্ত্রী সহবাস করলে ভোরে ফজরের নামাযের আগে আগেই এবং দিনে সহবাস করলে পরবর্তী নামাযের পূর্বেই স্বামী-স্ত্রী দুজনে গোসল করে নেয়া আবশ্যক। এ গোসলকে জানাবতের বা অপবিত্রতার গোসল বলে এবং গোসল না করা পর্যন্ত নাপাকী অবস্থায় থাকাকে জানাবতের অবস্থা বা জুনুবী হওয়া বলা হয়। জানাবত তথা ফরজ গোসলে যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করা দরকার। স্বামী-স্ত্রী দুজনই যৌনাঙ্গের পবিত্রতার ব্যাপারে খুবই যতœবান হতে হবে। স্বামী তার অঙ্গকে খুব ভালোভাবে ধুয়ে নিবে যেন চামড়ার মধ্যে বীর্য আটকে থাকতে না পারে। অনুরূপভাবে স্ত্রীও নিজের গোপন অঙ্গকে ভালোভাবে ধুয়ে নিবে। জানাবাত হতে পবিত্র হওয়ার পদ্ধতিকে বলে ফরজ গোসল।

ফরজ গোসল কাকে বলে

ফরজ গোসল ঐ গোসলকে বলা হয়, যে গুসল করা অপরিহার্য। বালেগ বয়সে নাপাক হলে অর্থাৎ কারো স্বপ্নদোষ হলে বা স্বামী-স্ত্রীর মিলনে গোসল ফরজ হলে।

গোসলের ফরজ কয়টি ও কি কি?

গোসলের ফরজ ৩ টি যথাঃ-

১. গড়গড়াসহিত কুলি করা। একবার কুলি করা ফরজ।
২. নাকে ভালভাবে পানি দিয়ে সাফ করা। একবার নাকের নরম জায়গা পর্যন্ত পানি পৌঁছিয়ে পরিষ্কার করা ফরজ।
৩. সারা শরীর পানি দিয়ে  ধৌত করা। সমস্ত শরীরে পানি পৌঁছানো বা ধৌত করা ফরজ।

সুতরাং কেউ যদি যে কোনভাবে তার গোটা দেহে পানি পৌঁছাতে পারে তাহলে সে বড় অপবিত্রতা মুক্ত হয়ে পবিত্র হয়ে যাবে। যেহেতু আল্লাহ্‌ তাআলা বলেছেন: “যদি তোমরা জুনুবি হও তাহলে প্রকৃষ্টভাবে পবিত্রতা অর্জন কর।”[সূরা মায়েদা, আয়াত: ৬]

ফরজ গোসলের সঠিক নিয়ম কি?

ফরজ গোসলের সঠিক নিয়মঃ মনে মনে জানাবত (নাপাকি বা অপবিত্রা) দূর করার নিয়ত করতে হবে। (অর্থাৎ, মনে মনে এই চিন্তা করবেন যে, নাপাকি দূর করার জন্য গোসল করছি)। তারপর প্রথমে লজ্জাস্থানে লেগে থাকা নাপাকি ধুয়ে ফেলবেন। তারপর সাবান বা এজাতীয় কিছু দিয়ে দুই হাত কব্জি পর্যন্ত ধুয়ে নিবেন। তারপর নামাজের অজুর ন্যায় পূর্ণাঙ্গ অজু করবেন। এরপর পানি দিয়ে মাথা ভিজিয়ে নিবেন। তারপর প্রথমে শরীরের ডান অংশে এবং পরে বাম অংশে পানি ঢালবেন। তারপর সারা দেহে পানি ঢালবেন।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেভাবে গোসল করতেন সেভাবে গোসল করা। 

যে ব্যক্তি জানাবাত (অপবিত্রতা) থেকে গোসল করতে চায় তিনি তার হাতের কব্জিদ্বয় ধৌত করবেন। এরপর লজ্জাস্থান ও লজ্জাস্থানে যা লেগে আছে সেসব ধৌত করবেন। এরপর পরিপূর্ণ ওযু করবেন। এরপর মাথার উপর তিনবার পানি ঢালবেন। এরপর শরীরের অবশিষ্টাংশ ধৌত করবেন। এটাই হচ্ছে পরিপূর্ণ গোসলের পদ্ধতি।[ফাতাওয়া আরকানুল ইসলাম থেকে সমাপ্ত, পৃষ্ঠা-২৪৮]

মায়মুনা (রা:) হতে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ ﷺ-এর জন্য গোসলের পানি রাখলাম। তা দিয়ে তিনি অপবিত্রতার গোসল করেন। নাবী ﷺ  বদনা নিজের ডান হাতের উপর কাৎ করে তা দুই বা তিনবার ধৌত করেন। অতঃপর তিনি তাঁর লজ্জাস্হানের উপর পানি ঢেলে বাম হাত দিয়ে ধৌত করেন। পরে তিনি মাটির উপর হাত ঘষে (দুর্গন্ধমুক্ত হওয়ার জন্য) তা পানি দিয়ে ধৌত করেন। অতঃপর তিনি কুলি করেন এবং নাক পরিষ্কার করেন। অতঃপর মুখমন্ডল ও দুই হাত ধৌত করেন। অতঃপর তিনি স্বীয় মাথা ও সর্বাংগে পানি ঢালেন। পরে তিনি উক্ত স্থান হতে অল্প দূরে সরে গিয়ে উভয় পা ধৌত করেন। (আবু দাউদ ২৪৫)

যদি আপনি অতীতে গোসলকালে গড়গড়া কুলি করা কিংবা নাকে পানি দেয়া পালন না করে থাকেন না-জানার কারণে কিংবা যে আলেমগণ এ দুটোকে ওয়াজিব বলেন না তাদের অভিমতের উপর নির্ভর করার কারণে সেক্ষেত্রেও আপনার গোসল সহিহ এবং এ গোসলের ভিত্তিতে আপনার আদায়কৃত নামাযও সহিহ; আপনাকে সে সকল নামায পুনরায় পড়তে হবে না। যেহেতু গড়গড়া কুলি ও নাকে পানি দেয়া সংক্রান্ত আলেমগণের মতভেদ অত্যন্ত শক্তিশালী যেমনটি ইতিপূর্বে আলোচিত হয়েছে।

আল্লাহ্‌ সকলকে তাঁর পছন্দনীয় ও সন্তোষজনক আমল করার তাওফিক দিন।
আল্লাহ্‌ই সর্বজ্ঞ।

যে সব কারণে গোসল ফরজ হয়

১. স্বপ্নদোষ বা উত্তেজনাবশত বীর্যপাত হলে। 
২. স্ত্রী-সঙ্গম বা নারী-পুরুষ এর মিলনে (সহবাসে বীর্যপাত হোক আর নাই হোক)। 
৩. মেয়েদের ঋতুগ্রাব বা হায়েয-নিফাস ও প্রসব শেষ হলে। 
৪. ইসলাম গ্রহন করলে (নব-মুসলিম হলে)  ইত্যাদি নিমিত্ত যে নাপাকি।
৫. স্বপ্নের কথা স্মরণ থাকুক বা না থাকুক শরীরে, কাপড়ে বা বিছানায় বীর্যের চিহ্ন দেখতে পেলে।

ফরজ গোসল করা অসম্ভব হলে কী করব?

বস্তুত পবিত্রতা অর্জনের মাধ্যম হচ্ছে পানি। যা আল্লাহ তাআলা পর্যাপ্ত পরিমাণে সরবরাহ  করে রেখেছেন। তারপরও অবস্থার আলোকে যদি পানি না পাওয়া যায় বা বান্দা অসুস্থ হয়ে পানি ব্যবহারে একেবারে অপারগ হয়, সে সময়ে সে গোসলের পরিবর্তে তায়াম্মুম করবে। এ মর্মে আল্লাহ তাআলা বলেন, যদি তোমরা রুগ্ন হও, অথবা সফরে থাক অথবা তোমাদের কেউ প্রসাব-পায়খানা সেরে আসে অথবা তোমরা স্ত্রীদের সাথে সহবাস কর, অতঃপর পানি না পাও, তবে তোমরা পবিত্র মাটি দ্বারা তায়াম্মুম করে নাও। আল্লাহ তোমাদেরকে অসুবিধায় ফেলতে চান না; কিন্তু তোমাদেরকে পবিত্র রাখতে চান এবং তোমাদের প্রতি স্বীয় নেয়ামত পূর্ণ করতে চান-যাতে তোমরা কৃতজ্ঞাতা প্রকাশ কর।(সূরা মায়েদা ০৬)

উল্লেখ্য,সব সময়ই মনে রাখতে হবে, গোসল ফরজ হওয়া সত্ত্বেও বিনা ওজরে গোসল না করে অপবিত্র অবস্থায় এক ওয়াক্ত নামাজের সময় অতিবাহিত হয়ে যাওয়া মারাত্মক গোনাহ। এক্ষেত্রে তীব্র লজ্জা কিংবা গোসলের পরিবেশ নাই মনে করা শরিয়তসম্মত ওজর নয়। (বাদায়ে, ১/১৫১)

ফরজ গোসলে অবহেলার শাস্তি

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, একদা আমি আমার এক প্রতিবেশীর জানাযাতে যোগদান করি। তার লাশ কবরে নামানোর সময় বিড়ালের ন্যায় একটি অদ্ভুত জানোয়ার কবরের ভিতরে বাইরে লম্বঝম্প করে লাশ কবরে নামাতে বাধার সৃষ্টি করতে লাগল। সেটিকে তাড়াবার জন্য সকলে মিলে চেষ্টা করলাম। কিন্তু কোন প্রকারই দূর করা গেল না। ব্যর্থ হয়ে অন্যত্র গিয়ে কবর খনন করা হল। সেখানে গিয়ে জন্তুটি ভয়ানক উৎপাত করতে লাগল। সেটিকে মারতে গিয়েও সর্ব প্রকার চেষ্টা ব্যর্থ হল। অগত্যা বাধ্য হয়ে অন্যত্র গিয়ে তৃতীয় কবর খনন করা হল। সেখানে গিয়েও জন্তুটি আরও বেশী উপদ্রব শুরু করল। অনন্যোপায় হয়ে আমরা তাড়াতাড়ি তৃতীয় কবরেই তাকে দাফন করতঃ সভয়ে দ্রুতপদে সেখানে হতে প্রস্থান করলাম। দাফনান্তে কবর হতে বজ্রবৎ ভীষণ এক আওয়াজ বের হয়েছিল। আমি জানার জন্য তার স্ত্রীর কাছে জিজ্ঞেস করলাম, তার স্ত্রী উত্তর দিল, সহবাসের পর তিনি ফরজ গোসলে অবহেলা করতেন। এতে তার ফজরের নামায কাযা হয়ে যেত। এছাড়া তার অন্য কোন পাপ আমি কখনো দেখি নাই।
আল্লাহ আমাদের সঠিকভাবে কুরআন ও সুন্নাহ মেনে জীবন যাপন করার তাওফিক দিক এবং পূর্বের না জেনে করা ভুল ক্ষমা করুক। আমিন।)

তথ্যসূত্র : কুরআন শরীফ, বুখারী, মুসলিম, তিরমিযী